নারায়ণগঞ্জে ফের “যুবরাজ” আতঙ্ক

নারায়ণগঞ্জ মেইল: এমপি পুত্র” বা “যুবরাজ” কথাটা শুনলেই আঁতকে ওঠে নারায়ণগঞ্জের মানুষ। বিগত ১৫ বছর গডফাদারদের দুঃশাসনে এই যুবরাজ বা এমপি পুত্রদের অত্যাচারে নিষ্পেষিত হওয়ার স্মৃতি তাদের ভেসে ওঠে। নতুন সরকারের আমলে আবারও সেই একই আতঙ্ক ফিরে এসেছে নারায়ণগঞ্জবাসীর মনে।

নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য এডভোকেট আবুল কালামের একমাত্র পুত্র আবুল কাউসার আশার বিরুদ্ধে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেনের বাড়ি ও অফিস দখলের অভিযোগ উঠেছে। রবিবার (৩ অক্টোবর) এমপি পুত্র আশাসহ আটজনের বিরুদ্ধে পুলিশ সুপার বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন মাকসুদ হোসেনের স্ত্রী নার্গিস মাকসুদ।

এর আগে গত ২১ জুন নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে খাইরুল ইসলাম সজীবকে চাঁদাবাজির অভিযোগে আটক করে নারায়ণগঞ্জ ডিবি পুলিশ। পরে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে মিন্টো রোড ডিএমপির ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। পরের দিন ২২ জুন সকালে মুচলেকা  নিয়ে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর একটি বড় শিল্প গ্রুপের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন খাইরুল। টাকা না দেওয়ায় গাড়ি আটকে রাখা হয়। পরে সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপে গাড়ি ছেড়ে দেন খাইরুল। তার বাবা আজহারুল ইসলাম সোনারগাঁ থানা বিএনপির সভাপতি এবং নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য। ডিবি আটক করার পর জেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক খাইরুল ইসলামকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

জানা যায়, বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী জেলা নারায়ণগঞ্জ। এই জেলার সুনাম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশও ছড়িয়েছে কিন্তু গত ১৫ বছর স্বৈরাচারী শাসন আমলে এক ভয়ঙ্কর গডফাদার পরিবারের হাতে চলে গিয়েছিল নারায়ণগঞ্জের নিয়ন্ত্রণ। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে একেএম শামীম ওসমান এবং নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে একেএম নাসিম ওসমান নামের দুই গডফাদার এমপি হয়ে নারায়ণগঞ্জের মানুষের ঘাড়ে সিন্দাবাদের ভুতের মতো চেপে বসে।

এদের সাথে সাথে তাদের দুই পুত্র আজমেরী ওসমান ও অয়ন ওসমান পিতার ক্ষমতায় আরো বেশি ভয়ংকর হয়ে ওঠে। কিশোর গ্যাং আর হোন্ডা বাহিনী তৈরি করে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, জমি দখল, ভূমিদস্যুতা থেকে শুরু করে নানা অপরাধের নেতৃত্ব দেন এই দুই এমপি পুত্র। তাদেরকে যুবরাজ নামেও আখ্যায়িত করা হতো সেসময়। এই দুই যুবরাজের অত্যাচারের হাত থেকে রেহাই পায়নি নারায়ণগঞ্জের কোনো মানুষ।

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে খুনি হাসিনা সরকার দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় নারায়ণগঞ্জের কলঙ্ক এই গডফাদার পরিবারও পালিয়ে যায়। সেইসাথে নারায়ণগঞ্জের মানুষ যুবরাজ আতঙ্ক থেকে মুক্তি পায়। তাই তারা নতুন করে আর কোনো যুবরাজ আতঙ্কে ভুগতে চায় না।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যারা বিজয়ী হয়ে এমপি হয়েছেন, তাদের পুত্রদের কোনো ভয়ঙ্কর রূপে দেখতে চায়নি নারায়ণগঞ্জের মানুষ। পিতার এমপি ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে আর কোনো পুত্র যাতে অপরাধের সাম্রাজ্য বিস্তার করতে না পারে সেই আহ্বান ছিলো আপামর নারায়ণগঞ্জবাসীর। কিন্তু নারায়ণগঞ্জবাসীর মনে আবারো এমপি পুত্র বা যুবরাজ আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালামের পুত্র আবুল কাউসার আশা এবং নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের পুত্র খায়রুল ইসলাম সজীবের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ মানুষের মনে আবারো যুবরাজ ভীতি চলে এসেছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি তারা এর সুষ্ঠু তদন্ত করে ভীতি দূর করার দাবি জানিয়েছেন।