সিদ্ধিরগঞ্জে কমিটি দিচ্ছে জেলা বিএনপি, ক্ষুব্দ মহানগর

নারায়ণগঞ্জ মেইল: নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর বিএনপির মাঝে বিবাদমান সিদ্ধিরগঞ্জ থানা কমিটি নিয়ে জল আরো ঘোলা হচ্ছে। সিদ্ধিরগঞ্জের ১০টি ওয়ার্ডের অধিকার নিয়ে জেলা মহানগরের রশি টানাটানি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিলো। বিএনপির মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ জেলা বিএনপির তৎকালীন সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ এবং মহানগর বিএনপির সভাপতি এড. আবুল কালাম ও সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামালকে আসামী করে নারায়ণগঞ্জের আদালতে মামলা ঠুকেছিলেন ১০ নং ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি গুলজার হোসেন খান। আদালত মহানগর বিএনপির সকল কার্যক্রমের উপর স্থগিতাদেশ জারি করেছিলো। ২০১৯ সালের ২৮ নভেম্বর এ মামলা দায়ের হয়।

গত প্রায় দেড় বছর যাবত চলমান সেই মামলা থাকা সত্বেও এবার সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির কমিটি দিতে চাচ্ছে জেলা বিএনপি। এ লক্ষ্যে তারা একটি উপ কমিটিও গঠন করেছে। জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক মাহফুজুর রহমান হুমায়ুনকে টিম লিডার করে এবং জেলা বিএনপির সদস্য এড. আবুল কালাম আজাদ বিশ্বাস, একরামুল কবীর মামুন, ইউসুফ আলী ভূইয়া ও মুস্তাকুর রহমানকে নিয়ে গঠন করা হয়েছে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা উপ কমিটি।

এদিকে বিএনপির গঠনতন্ত্র মোতাবেক সিটি কর্পোরেশনের আওতাভুক্ত ওয়ার্ডসমূহ মহানগরের অধীনে থাকার কথা। নারায়ণগঞ্জ বিএনপির সকল অঙ্গ ও সহযোগি সংগঠনও এ নিয়মে তাদের কমিটি গঠন করে থাকে। কিন্তু জেলা বিএনপি মহানগরের সে অধিকার কেড়ে নেওয়ায় তা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না মহানগর বিএনপির নেতাকর্মীরা। তাদের মতে সিদ্ধিরগঞ্জে জেলা বিএনপির কমিটি হবে অবৈধ, নিয়ম বহির্ভূত। তাছাড়া আদালতে এ নিয়ে একটি মামলা রয়েছে, রয়েছে স্থগিতাদেশ। এমতাবস্থায় জেলা বিএনপির সিদ্ধিরগঞ্জে কমিটি দেয়াটা কোনভাবেই ঠিক হচ্ছে না।

তবে এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অধ্যাপক মামুন মাহমুদ। তিনি নারায়ণগঞ্জ মেইলকে বলেন, বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশেই সিদ্ধিরগঞ্জে কমিটি দিচ্ছে জেলা বিএনপি। নির্বাচনের আসন ভিত্তিক কমিটি গঠনের নিয়ম মেনে ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ একসাথে রাখা হয়েছে। আর বন্দরের ৫টি ইউনিয়ন মহানগর বিএনপিকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। সবই করা হয়েছে চেয়ারপার্সনের নির্দেশনা মেনেই।

উল্লেখ্য, বিএনপির গঠনতন্ত্র বহির্ভূত কমিটি গঠন করায় নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সকল কার্যক্রম স্থগিত করেছিলো নারায়ণগঞ্জের একটি আদালত। ২৮ নভেম্বর বৃহস্পতিবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র সহকারি জজ শিউলী রানী দাসের আদালতে শুনানি শেষে এ আদেশ দেন আদালত । ওই মামলার বাদী গোলজার খানের আবেদনের প্রেক্ষিতে বাদী ও বিবাদী পক্ষের শুনানি শেষে আদালত বিরোধীয় কমিটির সকল কার্যক্রম স্থগিত করেন। বিরোধীয় কমিটির বিষয়ে হওয়া মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই কমিটির সকল কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন আদালত। আদেশে বলা হয় মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিরোধীয় কমিটির সকল কার্যক্রম বাদী ও বিবাদীকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার জন্য। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন নিয়ে মহানগর বিএনপির কমিটি গঠন করায় বিএনপির গঠনতন্ত্রের কোথাও আসন ভিত্তিক কমিটি গঠনের নিয়ম বিবাদী পক্ষ আদালতে উপস্থাপন করতে পারেনি।

কিন্তু মহানগর বিএনপির সভাপতি এড. আবুল কালাম ও সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামাল আদালতের এই নির্দেশ অমান্য করে আদেশের পরদিন ২৯ নভেম্বর সংঠনের প্যাডে সিল স্বাক্ষরসহ মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহ সভাপতি এড. সাখাওয়াত হোসেন খানকে বহিস্কারের সুপারিশ দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বরাবর প্রেরণ করেন। কোন প্রকার সাংগঠনিক কর্মকান্ড পরিচালনার উপর আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্বেও তারা সাংগঠনিক কর্মকান্ড করায় আদালত অবমাননার অপরাধ করেছেন বলে জানিয়েছেন বাদী পক্ষের আইনজীবী এবং পরবর্তী ধার্য তারিখে আদালতের কাছে এর প্রতিকার চাইবেন বলে জানান।

তবে একটি চিঠি ইস্যু করলেই আদালত অবমাননা করা হবে না বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামাল। কামাল বলেন, তাছাড়া চিঠিতে যে বিষয়ে লেখা হয়েছে তা আদালতের নির্দেশের আগে সংগঠিত, বহিস্কারের সুপারিশ আমাদের এর আগেই নেয়া ছিলো, তাই আমার দৃষ্টিতে এটা আদালত অবমাননার পর্যায়ে পরে না।

আদালত সূত্রে জানাগেছে, বিএনপির গঠনতন্ত্রের ৪ এর (ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ‘ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা/থানা, পৌরসভা, মহানগর, জেলা- এই শব্দগুলো বাংলাদেশ সরকার/ নির্বাচন কমিশন কর্তৃক দেওয়া অর্থই বুঝাবে।’ অর্থাৎ বাংলাদেশ সরকারের নির্ধারিত এসব এলাকা নিয়েই বিএনপির কমিটি গঠন করতে হবে। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে মহানগর বিএনপির কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে মহানগরীর মুল এলাকা সিদ্ধিরগঞ্জের ১নং থেকে ১০নং ওয়ার্ড পর্যন্ত এলাকা জেলা বিএনপির সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হয় যেখানে মহানগর কমিটিতে রাখা হয়নি। আর সিটি কর্পোরেশন গঠন করেন সরকার এবং এখানে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের আয়োজন করেন। ফলে মহানগর বিএনপির কমিটি সুস্পষ্টভাবে দলের গঠনতন্ত্র বহির্ভুত কমিটি গঠন করা হয়েছে মর্মে বাদী পক্ষের আইনজীবী আদালতে উপস্থাপন করেন।

শুনানিতে বিবাদী পক্ষ স্থগিতের বিরুদ্ধে আপত্তি জানান। এর আগে আদালতে মামলার বাদী গোলজার হোসেন শুধুমাত্র নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন এলাকা নিয়ে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির কমিটি গঠন করায় কমিটির সকল কার্যক্রম স্থগিতের আবেদন করেন।
জানাগেছে, এর আগে গত ১২ নভেম্বর মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জ মহানগরীর ১০নং ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি গোলজার খান ও একই ওয়ার্ডের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক (সাবেক পৌর এলাকা) বিএনপি নেতা নূরে আলম শিকদার বাদী হয়ে একই আদালতে মামলাটি করেন। মামলার শুনানি শেষে পরবর্তী সাত দিনের মধ্যে কেন কমিটি অবৈধ হবে না জানিয়ে বিবাদীদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন আদালত। পরদিন ১৩ নভেম্বর বুধবার আদালত থেকে এ সংক্রান্ত নোটিশ বিবাদীদের হাতে পৌঁছানো হয়। এ বিষয়ে আদালতে বিবাদীরা জবাব দেন।

এরপর গত ১৯ নভেম্বর বিরোধীয় কমিটির বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আদালতের কাছে কমিটির সকল কার্যক্রম স্থগিতের আবেদন করেন বাদী গোলজার হোসেন। ওই আবেদনের বিষয়ে ২৮ নভেম্বর বৃহস্পতিবার শুনানি শেষে আদালতে কমিটির সকল কার্যক্রম স্থগিত রাখার আদেশ দেন।

জানাগেছে, দলের গঠনতন্ত্র বহির্ভূত নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর বিএনপির কমিটি গঠন করায় মামলায় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান মনির, সেক্রেটারি অধ্যাপক মামুন মাহামুদকে মোকাবেলা বিবাদী এবং মহানগর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম ও সেক্রেটারি এটিএম কামালকে মুল বিবাদী করা হয়। নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সীমানা ও গঠনতন্ত্র মানা হয়নি বলেও অভিযোগ করে ওই মামলা করা হয়।

মামলা দায়েরের পর বাদী গোলজার হোসেন খান অভিযোগ করেছিলেন, নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটিতে অল্প ক’জন নেতা স্থান পেলেও মহানগরের কমিটিতে নারায়ণগঞ্জ সিটি কপোর্রেশনের ১নং থেকে ১০নং ওয়ার্ড পর্যন্ত ১০টি ওয়ার্ডের কোনো নেতাই পদ পদবি পাননি। এই ১০টি ওয়ার্ডের মূল দলের নেতাকর্মীরা দলীয় পদ পদবির ক্ষেত্রে অবহেলার শিকার হচ্ছেন। দলের জন্য প্রাণপন কাজ করলেও দলের নেতারা তাদের কোনো পরিচয় দিচ্ছেন না। আমাদেরকে পদ পদবি যেন দেয়া হয় সেজন্যই এ মামলা। আমরা তো জাগোদল থেকেই যুক্ত বিএনপির সঙ্গে।

অন্যদিকে আরও জানাগেছে, ২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি আবুল কালামকে সভাপতি ও এটিএম কামালকে সেক্রেটারি করে ২৩ সদস্য বিশিষ্ট নারায়ণগঞ্জ মহানগর আংশিক কমিটি গঠন করা হয় এবং একইদিন কাজী মনিরুজ্জামান মনিরকে সভাপতি ও অধ্যাপক মামুন মাহামুদকে সেক্রেটারি করে ২৬ সদস্য বিশিষ্ট নারায়ণগঞ্জ জেলার আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়।

কমিটি গঠনে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মুল এলাকা সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ১০টি ওয়ার্ডকে জেলা বিএনপির সঙ্গে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। যেখানে সিটি কর্পোরেশনের ১নং থেকে ১০নং ওয়ার্ড রয়েছে। জেলা বিএনপির আওতাধীন এলাকা বন্দরের ৫টি ইউনিয়ন, সদর মডেল থানার আরও দুটি ইউনিয়নকে মহানগর কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ওই সময় স্থানীয় নেতারা দাবি করেছেন- জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে আসনভিত্তিক সুবিধার বিষয়টি হিসেবে করেই দুটি কমিটি গঠন করা হয়।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

নারায়ণগঞ্জ মেইলে এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

সর্বশেষ