চাঁদাবাজের তালিকায় শীর্ষস্থান, ইমেজ সংকটে নারায়ণগঞ্জ বিএনপি

নারায়ণগঞ্জ মেইল: সারাদেশে চাঁদাবাজের তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করেছে নারায়ণগঞ্জ। বর্তমানে দেশে আওয়ামী লীগের লোকজন প্রকাশ্যে না থাকায় এই চাঁদাবাজের তালিকায় বেশিরভাগই বিএনপির নেতাকর্মীদের নাম থাকার সম্ভাবনা বেশি। বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলসহ বিভিন্ন সেক্টর দখল করে চাঁদাবাজার মহোৎসব শুরু করেছে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এই কারণেই চাঁদাবাজির তালিকা সারাদেশে শীর্ষস্থানে উঠে এসেছে নারায়ণগঞ্জের নাম। এতে করে চরম ইমেজ সংকটে পড়েছে নারায়ণগঞ্জ বিএনপি।

ঘটনার বিবরণে প্রকাশ, দেশজুড়ে চিহ্নিত ৩৫৮৬ জন চাঁদাবাজের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫৬৫ জনের নাম রয়েছে নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলে। একইভাবে ২২৫৮ জন ‘আলোচিত সন্ত্রাসী’র মধ্যেও সর্বোচ্চ ৪০৮ জনই এই অঞ্চলের তালিকায়। ইংরেজি দৈনিক টিভিএস এ সম্পর্কিত খবর প্রকাশ করেছে।

২০২৪ এর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নারায়ণগঞ্জে বিএনপির পদধারী ও নামধারীরা নানা ধরনের অপকর্মে লিপ্ত হন।

টিভিএসের প্রতিবেদন মতে, এসআরবির তালিকায় চাঁদাবাজের সংখ্যায় প্রথম অবস্থানে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা এসআরবি-১১ ব্যাটালিয়ন (৫৬৫ জন)।

সূত্র মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নারায়ণগঞ্জে চরম বেপরোয়া হয়ে উঠেছে কতিপয় বিএনপি নামধারী নেতা ও তাদের অনুসারীরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, যাদের দলে কোনো সাংগঠনিক পদ-পদবী নেই, বিগত ১৭ বছরে আন্দোলন-সংগ্রামে যাদের কোনো ভূমিকা ছিল না, তারাই এখন জেলার সব সেক্টর দখল করে আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছে।

স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, নারায়ণগঞ্জ সিটি  হাট-ঘাট, ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, পাগলা, গোদনাইল, ফতুল্লার বালু মহাল ও জলমহাল, ট্রাকস্ট্যান্ড, বাসস্ট্যান্ড, ফুটপাত, হাট-বাজার, জুট সেকেন্ড নিয়ন্ত্রণ ও শীতলক্ষ্যা নদীর চর দখল করে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি করছে এই চক্র।

শহীদনগর, মীর জুমলা সড়ক , শহরের অবৈধ পরিবহন স্ট্যান্ড, বক্তবলী মাটি সেক্টর,  কদমতলী-ভূইগড় সাঁকোর টোল, রূপগঞ্জের ইটভাটা ও ভূমি দখল— সবখানেই এদের নিয়ন্ত্রণ। প্রতিদিন সাধারণ ব্যবসায়ী, অটোচালক, ট্রাকচালক ও কৃষকের কাছ থেকে জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে মারধর ও মামলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রটি এখন মাদক ব্যবসারও নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ ও কাশীপুরের বিভিন্ন স্পটে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হলেও তাদের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না। একই সাথে সরকারি খাস জমি, হিন্দু সম্প্রদায়ের জমি ও সাধারণ মানুষের জমি জোরপূর্বক দখল করে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এদের বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও দখলবাজির কারণে নারায়ণগঞ্জে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে।

গোয়েন্দা সংস্থার একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের শীর্ষ চাঁদাবাজদের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে নারায়ণগঞ্জের নাম। চাঁদাবাজির টাকা ভাগাভাগি নিয়ে নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ, গোলাগুলি ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা এখন নিত্যদিনের ঘটনা। সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। পুলিশের কাছে অভিযোগ করেও প্রতিকার পাচ্ছে না ভুক্তভোগীরা, কারণ এই চক্রটি নিজেদের বিএনপির প্রভাবশালী নেতা পরিচয় দিয়ে প্রশাসনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।

ত্যাগী বিএনপি নেতাকর্মীরা বলছেন, এই হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারী চাঁদাবাজদের কারণে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের ইমেজ মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে। জনগণের মধ্যে একটি ভুল বার্তা যাচ্ছে যে, বিএনপি ক্ষমতায় আসার আগেই যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে পরে কী হবে?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা বিএনপির এক সিনিয়র নেতা বলেন, “তারেক রহমান বারবার বলছেন, চাঁদাবাজদের বিএনপিতে কোনো জায়গা নেই। কিন্তু তৃণমূলের এই চাঁদাবাজরা তার নির্দেশ অমান্য করে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। এদের এখনই লাগাম টেনে না ধরলে নারায়ণগঞ্জে বিএনপি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।”

এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে এসব চিহ্নিত চাঁদাবাজ, ভূমিদস্যু ও মাদক ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে দল থেকে বহিষ্কার এবং আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক, অন্যথায় নারায়ণগঞ্জের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।