সিটি মেয়র: অপরাজেয় আইভী নাকি অদম্য সাখাওয়াত

নারায়ণগঞ্জ মেইল: শেষ হয়েছে বহুল জল্পনা-কল্পনার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে সরকার গঠন করছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনের মধ্যে চারটিতে ধানের শীষের প্রার্থীরা বিজয়ী হলেও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিজয়ী হয়েছেন জামাত জোট নেতৃত্বাধীন এনসিপি’র শাপলাকলি প্রতীকের প্রার্থী এডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন।

জাতীয় নির্বাচন শেষ হতে না হতেই নারায়ণগঞ্জে শুরু হয়ে গেছে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের আলোচনা। আগামী দিনে সিটি মেয়র পদে কে প্রতিদ্বন্দিতা করবেন তা নিয়া রাজনৈতিক অঙ্গন ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদের আলোচনায় সর্বপ্রথম যার নাম আসে তিনি হলেন সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী। গত তিনটি সিটি নির্বাচনে অপরাজিত আইভী বর্তমানে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গণহত্যার মামলায় কারাগারে আছেন। তারপরেও জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে নারায়ণগঞ্জবাসীর পছন্দের তালিকায় শীর্ষস্থান ধরে রেখেছেন তিনি।

এরপরে যার নাম আসে তিনি হচ্ছেন স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জের রাজপথে সবচেয়ে প্রতিবাদী এবং নির্যাতিত বিএনপি নেতা এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। ২০১৬ সালের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে যখন বিএনপি’র বাঘা বাঘা নেতারা মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সাহস পায়নি তখন ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছেন তৎকালীন সাত খুন মামলার আলোচিত আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত এবং নির্বাচনের শেষ পর্যন্ত আওয়ামী শক্তির বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াই করেছেন।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী ২০০৩ সালে নিউজিল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে এসে দীর্ঘ ১৯ বছর পর অনুষ্ঠিত হওয়া নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দিতা করেন এবং পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান আলী আহমদ চুনকার মেয়ে পরিচয়ে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন।

এরপর নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর অনুষ্ঠিত তিনটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে অপরাজিত ছিলেন ডা. সেলিম হায়াত আইভী এবং বাবার পরিচয় ছাপিয়ে নিজ দক্ষতায় নারায়ণগঞ্জের মানুষের মন জয় করে নেন তিনি। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িত থাকলেও তৎকালীন গডফাদার শামীম ওসমান ও তার সন্ত্রাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বদা প্রতিবাদে সোচ্চার ছিলেন তিনি। মূলতঃ আইভীই নারায়ণগঞ্জবাসীকে ওসমান পরিবারের অন্যায় অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শিখিয়েছেন। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের সকল শ্রেণীর নেতাকর্মী পালিয়ে গেলেও ডা. সেলিনা হায়াত আইভী তার নিজ বাসায় রয়ে যান। শামীম ওসমানরা পালিয়ে গেলেও আইভী পালিয়ে যাননি।

অপরদিকে ২০০৬ সালে ক্ষমতা ছাড়ার পর থেকে স্বৈরাচারি হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি নেতাকর্মীরা। ফলস্বরূপ হাসিনার পালিত পুলিশ বাহিনীর দেওয়া অসংখ্য মিথ্যা মামলার আসামী হয়ে দিনের পর দিন তাদেরকে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাযাবর জীবন যাপন করতে হয়েছে, জেল খাটতে হয়েছে বারবার।

এ সময়ে নারায়ণগঞ্জের রাজপথের সবচেয়ে আলোচিত নাম হচ্ছে এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। সরকার বিরোধী যে কোনো কর্মসূচিতে সবার আগে থাকতেন তিনি। নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে পুলিশের সাথে লড়াই করেছেন, পুলিশের হামলার স্বীকার হয়েছেন, এমনকি জেলও খেটেছেন একাধিকবার তবুও রাজপথ থেকে সরে আসেননি।

২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলায় চরম সাহসিকতার সাথে তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকার ও তার এলিট বাহিনীর বিপক্ষে গিয়ে আইনী লড়াই করেছেন বুক চিতিয়ে। ক্ষমতাশীণদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে এবং কোটি টাকার লোভনীয় অফারকে দুপায়ে মাড়িয়ে তিনি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে লড়ে গেছেন এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি পর্যন্ত আইনী লড়াই চালিয়ে গেছেন যা এখনও নারায়ণগঞ্জবাসীর কাছে বিরল ঘটনা হিসেবে সমাদৃত হয়ে আছে।

এছাড়াও গত ১৫ বছর ফ্যাসিষ্ট সরকারের দেওয়া অসংখ্য মিথ্যা মামলায় আসামী হওয়া বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের মামলা বিনা খরচে লড়ে গেছেন এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। নারায়ণগঞ্জ আদালতে বিএনপির নেতাকর্মীদের ভরসার আশ্রয়স্থল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এই আইনজীবী নেতা। আইনী সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে কে কার লোক এটা কখনো বিবেচনা করেননি তিনি। এমনও ঘটনা ঘটেছে নিজের পকেটের টাকা খরচ করে যে বিএনপি নেতাকে তিনি জামিন করিয়েছেন সে নেতা ঐদিনই তার বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন, এমনকি সাখাওয়াতের বহিস্কারও দাবি করেছেন। তবুও তিনি পিছপা হননি।

এসব দিক বিবেচনায় আসন্ন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী এবং নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহবায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের জমজমাট লড়াই দেখার অপেক্ষা করছে নারায়ণগঞ্জবাসী।

নারায়ণগঞ্জ মেইলে এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

সর্বশেষ